ফ্রি সফটওয়্যার, প্রিমিয়াম পাওয়ার – সেরা ৬টি টুলের তালিকা
আমরা যখন নতুন একটি পিসি বা ল্যাপটপ কিনি, তখন আমাদের অনেক ধরণের সফটওয়্যারের প্রয়োজন হয়। ফাইল ডাউনলোড করা থেকে শুরু করে অডিও এডিটিং কিংবা পিসি সুরক্ষা—সবক্ষেত্রেই আমরা দামী সব সফটওয়্যারের নাম শুনি।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই সফটওয়্যারগুলোর বেশিরভাগই বেশ ব্যয়বহুল। অনেকে আবার টাকা বাঁচাতে 'ক্র্যাক' বা পাইরেটেড ভার্সন ব্যবহার করেন, যা আপনার পিসির নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
কিন্তু আপনি কি জানেন, দামী এই সফটওয়্যারগুলোর প্রায় সবগুলোরই এমন কিছু ফ্রি এবং ওপেন সোর্স বিকল্প আছে যা দামী সফটওয়্যারের মতোই সমান কার্যকরী? আজকের ব্লগে আমরা এমন ৬টি সেরা ফ্রি সফটওয়্যার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা আপনার কয়েক হাজার টাকা বাঁচিয়ে দেবে।
১. দ্রুত ফাইল ডাউনলোডের জন্য: AB Download Manager (IDM-এর সেরা বিকল্প)
ইন্টারনেট থেকে বড় কোনো ফাইল দ্রুত ডাউনলোড করার কথা বললেই সবার আগে মাথায় আসে Internet Download Manager (IDM) এর নাম। এটি ফাইলকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে ডাউনলোড করে বলে ব্রাউজারের চেয়ে অনেক বেশি গতি পাওয়া যায়। কিন্তু আইডিএম ফ্রি নয়, এক মাসের ট্রায়াল শেষ হলেই এটি বারবার টাকা দিয়ে কেনার নোটিফিকেশন দেয় যা খুবই বিরক্তিকর।
এর চমৎকার সমাধান হলো AB Download Manager। এটি একটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং ওপেন সোর্স সফটওয়্যার। আইডিএম-এর মতো এটিও আপনার ফাইলকে মাল্টিপল কানেকশন ব্যবহার করে ডাউনলোড করে, ফলে আপনার ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ গতি পাওয়া যায়। এর ইন্টারফেস অত্যন্ত আধুনিক এবং এটি গুগল ক্রোম বা ফায়ারফক্সের মতো সব জনপ্রিয় ব্রাউজারের সাথে সহজেই ইন্টিগ্রেট করা যায়। যেহেতু এটি ওপেন সোর্স, তাই এতে কোনো লুকানো ভাইরাস বা ম্যালওয়্যারের ভয় নেই।
২. রিমোট ডেস্কটপ কন্ট্রোল: RustDesk (TeamViewer ও AnyDesk-এর বিকল্প)
অফিসের কাজ কিংবা বন্ধুর কম্পিউটারের কোনো সমস্যা সমাধান করে দেওয়ার জন্য আমরা রিমোট ডেস্কটপ সফটওয়্যার ব্যবহার করি। TeamViewer বা AnyDesk এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলেও এগুলোতে এখন অনেক সীমাবদ্ধতা চলে এসেছে। ফ্রি ভার্সন ব্যবহার করলে কিছুক্ষণ পরপর সেশন আউট হয়ে যায় এবং বারবার লাইসেন্স কেনার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
এই ঝামেলার সহজ সমাধান হলো RustDesk। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং এতে কোনো সেশন টাইমাউটের ভয় নেই। আপনি যতক্ষণ খুশি অন্য একটি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর নিরাপত্তা। আপনি যদি অনেক বেশি সিকিউরিটি নিয়ে চিন্তিত হন, তবে চাইলে আপনি আপনার নিজের সার্ভারে এটি হোস্ট করতে পারেন। এটি ব্যবহার করা অত্যন্ত সহজ এবং উইন্ডোজ, ম্যাক ও লিনাক্স সব প্ল্যাটফর্মেই এটি কাজ করে।
৩. লাইভ ওয়ালপেপারে সাজান ডেস্কটপ: Lively Wallpaper (Wallpaper Engine-এর বিকল্প)
অনেকেই নিজের কম্পিউটার স্ক্রিনকে সুন্দর করতে লাইভ বা এনিমেটেড ওয়ালপেপার ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। স্টিম প্ল্যাটফর্মে Wallpaper Engine নামক একটি পেইড সফটওয়্যার এই কাজের জন্য সেরা। তবে সামান্য কাস্টমাইজেশনের জন্য টাকা খরচ করতে না চাইলে আপনি ব্যবহার করতে পারেন Lively Wallpaper।
এটি একটি ওপেন সোর্স সফটওয়্যার যা আপনি সরাসরি মাইক্রোসফট অ্যাপ স্টোর থেকেই ডাউনলোড করতে পারবেন। এটি অত্যন্ত লাইটওয়েট, ফলে আপনার পিসি স্লো হবে না। আপনি যেকোনো ভিডিও ফাইল, জিআইএফ (GIF) এমনকি ইউটিউব ভিডিওকেও ওয়ালপেপার হিসেবে সেট করতে পারবেন। ভালো মানের এনিমেটেড ওয়ালপেপার পেতে আপনি motionbg.com ওয়েবসাইটটি ঘুরে দেখতে পারেন, যেখানে ফ্রিতে অনেক সুন্দর সুন্দর কালেকশন রয়েছে।
৪. পিসি সুরক্ষায় সেরা ফ্রি অ্যান্টিভাইরাস: Bitdefender Free Antivirus
অনেকেরই ধারণা উইন্ডোজের নিজস্ব সিকিউরিটি বা 'উইন্ডোজ ডিফেন্ডার' যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে আমরা থার্ড পার্টি অ্যান্টিভাইরাস খুঁজি। কিন্তু ক্যাস্পারস্কি বা ইসেট-এর মতো ভালো মানের অ্যান্টিভাইরাসগুলো বেশ দামী। টাকা খরচ না করে যদি সেরা সুরক্ষা পেতে চান, তবে Bitdefender Free Antivirus হবে আপনার সেরা পছন্দ।
বাজারে অনেক ফ্রি অ্যান্টিভাইরাস থাকলেও বিটডিফেন্ডার কেন সেরা? কারণ এটি খুব বেশি রিসোর্স ব্যবহার করে না, ফলে আপনার পিসি হ্যাং হবে না। এর ডাটাবেজ প্রতিদিন আপডেট হয়, তাই নতুন সব ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার থেকে আপনার পিসিকে সুরক্ষিত রাখে। এছাড়া অনলাইন ট্রানজ্যাকশন বা ফিশিং অ্যাটাক থেকে সুরক্ষা দিতে এর অটোমেটিক স্ক্যানিং সিস্টেম দারুণ কার্যকর।
৫. ফাইল জিপ ও আনজিপ করার ম্যাজিক টুল: 7-Zip (WinRAR-এর বিকল্প)
কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের কাছে WinRAR একটি অতি পরিচিত নাম। ফাইল কম্প্রেস করা বা জিপ ফাইল খোলার জন্য এটি বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়। উইনরার-এর একটি মজার বিষয় হলো এর ট্রায়াল পিরিয়ড শেষ হলেও এটি ব্যবহার করা যায়, কিন্তু প্রতিবার ফাইল খোলার সময় একটি বিরক্তিকর লাইসেন্স মেসেজ সামনে চলে আসে।
আপনি যদি এই বিরক্তি থেকে মুক্তি পেতে চান এবং আরও পাওয়ারফুল টুল চান, তবে আজই 7-Zip ইন্সটল করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং ওপেন সোর্স। এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো সময়সীমা বা বিরক্তিকর মেসেজ নেই। বিশেষ বিষয় হলো, এটি WinRAR-এর চেয়েও উন্নত প্রযুক্তিতে ফাইল কম্প্রেস করতে পারে (বিশেষ করে .7z ফরমেটে), যা আপনার স্টোরেজ বাঁচাতে সাহায্য করবে। এর ইউজার ইন্টারফেস কিছুটা পুরনো মনে হতে পারে, কিন্তু কাজের দিক থেকে এটিই সেরা।
৬. প্রফেশনাল অডিও এডিটিং: Audacity (Adobe Audition-এর বিকল্প)
আপনি কি পডকাস্ট করেন, ভয়েস ওভার দেন কিংবা মিউজিক নিয়ে কাজ করেন? তবে আপনার অবশ্যই একটি ভালো অডিও এডিটর প্রয়োজন। Adobe Audition এই কাজের জন্য ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড হলেও এর মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি অনেক বেশি।
এর বিকল্প হিসেবে গত দুই দশক ধরে অডিও এডিটরদের প্রিয় সফটওয়্যার হলো Audacity। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি হওয়া সত্ত্বেও এতে প্রফেশনাল লেভেলের সব টুলস রয়েছে। আপনি সহজেই ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ রিমুভ করতে পারবেন, ইফেক্ট দিতে পারবেন এবং মাল্টি-ট্র্যাক এডিটিং করতে পারবেন। যারা নতুন কাজ শুরু করছেন তাদের জন্য এটি শেখা যেমন সহজ, তেমনি প্রফেশনালদের জন্য এতে VST প্লাগিন ব্যবহারের সুবিধাও রয়েছে।
শেষ কথা: ফ্রি সফটওয়্যার, প্রিমিয়াম পাওয়ার – সেরা ৬টি টুলের তালিকা
প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের অনেক কাজের জন্য দামী সফটওয়্যারের প্রয়োজন হয় ঠিকই, কিন্তু ইন্টারনেটে খুঁজলে এমন অনেক ফ্রি এবং ওপেন সোর্স টুল পাওয়া যায় যা পেইড সফটওয়্যারের চেয়েও ভালো সার্ভিস দেয়। পাইরেটেড বা ক্র্যাক সফটওয়্যার ব্যবহার করে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে না ফেলে এই ফ্রি বিকল্পগুলো ব্যবহার শুরু করুন। এতে আপনার পিসি যেমন ফাস্ট থাকবে, তেমনি সাশ্রয় হবে আপনার কষ্টার্জিত টাকা।





অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url